গোপালের মা ও আদরের গোপাল

তিনি অঘোরমণি দেবী, তবে তাঁর আসল পরিচিতি "গোপালের মা" নামে। নিবাস ছিল কলকাতার কাছে কামারহাটি গ্রামে। ৯ বছর বয়সে বিয়ে, আর বিধবা হলেন ১৪ বছরে। স্বামীর ঘর হারিয়ে নব-কিশোরী এলেন ভাইয়ের বাড়িতে। ভাই তো কামারহাটিতে কৃষ্ণ মন্দিরের পুরোহিত। সেখানে মন্দিরের কাজে হাত লাগলেন। আর শিশু কৃষ্ণকে পেলেন দেবতা হিসেবে। কিন্তু স্বচক্ষে তাঁর দেখা পেলেন কই? মনে চলতো এক মানসিক অস্থিরতা। ইষ্টকে দেখার, নিজের করে পাবার আকুলতা। তারপর কেটে গেলো কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব। চললো মন্দিরের কাজ, আর সুদীর্ঘ তপস্যা। কিন্তু কোথায় সেই জীবন-বল্লভ? ৩০ বছরেও তো তাঁর আসার সময় হলো না। 

বৃদ্ধা অঘোরমণি ১৮৮৪ সালের এক শরৎকালের বিকেলে চললেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। তখন তাঁর বয়স প্রায় ৬২। মন্দিরের পাশে ছোট ঘরখানিতে কে যেন তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলো। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে স্বাগত জানালেন। ঘরে বসালেন, ভক্তিগীতি গেয়ে শোনালেন। ১৪ বছরের বড় এই বৃদ্ধার মধ্যে সাধক দেখলেন ভক্তির আকুলতা। বুঝলেন, এই নারীর চোখ ঈশ্বরপ্রেমের তীব্র অনুভূতিতে পূর্ণ। আবার আসতে বললেন তাঁকে। অঘোরমণির দক্ষিণেশ্বরে যাওয়া ঘন ঘন হতে লাগল। কিন্তু গুরু তাঁর সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলতেন না। বেশিরভাগ সময় শুধু তাঁর তৈরী করা খাবার নিয়েই কথা হতো। অঘোরমণি ভাবতেন আর যাবেন না দক্ষিণেশ্বরে। কিন্তু প্রতিবারই সে সংকল্প ভেঙে যেত। কি যে এক আশ্চর্য টান!

সময় বয়ে বললো। পরের বছর বসন্তের এক সকালে বিছানায় শুয়ে অঘোরমণি দেখলেন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর পাশে বসে আছেন। হাসি মুখ। ডান হাত মুঠো করা। তারপরেই সেই রূপ অদৃশ্য। আবির্ভূত হয়েছে এক ছোট্ট শিশু – গোপাল! সে কেঁদে বললো, তার মাখন চাই। আনন্দে কেঁদে ফেললেন বৃদ্ধা। বললেন, আমি তোমার জন্য মাখন কোথায় পাবো? গোপাল শুনল না সে কথা। তার তো খিদে পেয়েছে। অগত্যা নারকোলের নাড়ু বানাতেই হলো। পরদিনই কাঁদতে কাঁদতে গুরুর কাছে পৌঁছালেন অঘোরমণি। গুরু তখন সমাধিতে বিভোর। তাঁকে দেখে সানন্দে তাঁর কোলে বসে পড়লেন। রক্ত-মাংসের গোপাল! অঘোরমণি অস্ফুটে বললেন, এসো আমার সোনা। তোমার জন্য খাবার এনেছি। সেই দিন থেকে তিনি হয়ে উঠলেন গোপালের মা। 

শুরু হলো গোপালের দুষ্টুমি। সে কখনো তাঁর জপের মালা কেড়ে নিত। তাঁকে শান্ত করতে তিনি আদর করে খাবার খাওয়াতেন, ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতেন। গোপাল আবার এনে দিতো মায়ের জন্য জ্বালানির কাঠ। চলতে লাগলো সেই দিব্যলীলা। অঘোরমণি বুঝলেন, এতদিনে তাঁর তপস্যা সফল হয়েছে। ইষ্ট এসেছেন মানুষের রূপে, দাঁড়িয়েছেন আঁখির আগে। গোপালের মায়ের মুখে তাঁর ঈশ্বর দর্শনের গল্প শুনে গভীরভাবে মুগ্ধ হতেন যুবক নরেন্দ্র। শুধু তিনি নন, সাগরপারের কন্যা নিবেদিতাও। শেষ বয়সে নিবেদিতার বাড়িতেই থাকতেন অঘোরমণি। সাথে তাঁর রামায়ণের খন্ড, চশমা, আর জপমালা ভর্তি ছোট বাক্স। আর কিসেরই বা প্রয়োজন তাঁর। এ জীবনে যা পাওয়ার, তা তো লাভ হয়েছে। 

১৯০৬ সালে দেহত্যাগের আগে, ৮৫ বছরের অতিবৃদ্ধার পাশে এসে বসলেন শ্রীমা সারদা। গোপালের-মা ধীরস্বরে বললেন, “গোপাল, তুমি এসেছ? এতদিন তুমি আমার কোলে বসেছিলে। আজ তোমার পালা আমাকে তোমার কোলে নেওয়ার।” শ্রীমা সস্নেহে তাঁর শরীর স্পর্শ করলেন। ভোরবেলা গঙ্গার পবিত্র জল স্পর্শ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন অঘোরমণি।




Comments

Popular posts from this blog

গ্রন্থ সমালোচনা: চিরসখা — নবকুমার বসু

বাঙাল বাড়ির ষষ্ঠী পুজো

মাধ্যমিকের পঁচিশ বছর: ১৯৯৫—২০২০