গ্রন্থ সমালোচনা: শ্রীময়ী মা — নবকুমার বসু

সদ্য শেষ করলাম নবকুমার বসুর উপন্যাস "শ্রীময়ী মা", সারদা দেবীর জীবন অবলম্বনে লেখা দীর্ঘ উপন্যাস। তাঁকে নিয়ে লেখা গ্রন্থের সংখ্যা কম নয়। তাঁর সাক্ষাৎলাভ করেছেন এমন মানুষেরা, এবং পরবর্তীকালে তাঁকে অনুভব করেছেন এমন মানুষেরা অনেকেই মায়ের কথা নিবেদন করেছেন তাঁদের নিজস্ব ভঙ্গিতে। নবকুমার বসুর গ্রন্থটি অন্য আঙ্গিকের মনে হয়েছে, কারণ তাঁর উপন্যাস রচনার নৈপুণ্য। তিনি এখানে সাল তারিখের উল্লেখে ইতিহাসের কথন তৈরী করেননি, বরং সৃষ্টি করেছেন সাধারণের মাঝে থাকা এক রক্তমাংসের মহামানবীর জীবন আখ্যান, চিত্রের পরে চিত্রে, এক শিল্পীর ভূমিকায়। কাহিনীর সূচনা জয়রামবাটি গ্রামের ছয় বছর বয়সের এক শিশু কন্যার বিবাহ সময় থেকে। স্বামীরূপে যাঁকে পেলেন, শিশুকাল থেকে তাঁর সাথে ঘর করার সুযোগ ঘটেনি তাঁর। কিন্তু দুই মনের মাঝে ঘটেছিলো এক অদৃশ্য অবর্ণনীয় সেতু বন্ধন। দুজনেই হয়ে উঠেছিলেন দুজনার মনের মতো, অথচ সবই মনে মনে। যে সামান্য সময়ের দেখা, সেখানেই সেই যুবক শিশু থেকে কিশোরী হয়ে ওঠা এই কন্যাকে প্রস্তুত করেছিলেন এক গভীর মননে, দীক্ষিত করেছিলেন এক চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক বোধে। সেই প্রস্তুত হবার সময়টি বড়ো যত্নে লিখেছেন ঔপন্যাসিক নবকুমার। কাহিনীর পরে কাহিনীর সূত্রে তিনি দেখিয়েছেন সামান্যের মাঝে এক অসামান্যার আলোর পথে যাত্রা। নানান কটূক্তি, হিংসা, তিরস্কার, দুঃসহ অর্থাভাব সব কিছুর মাঝে আলোকিত হয়ে উঠছেন তিনি। স্বামী তাঁকে অতি সন্তর্পনে জাগরিত করছেন মাতৃত্বের স্বর্গে। এ এমন এক জগৎ যেখানে শরীর নয়, সুখ নয়, সীমার মাঝে অসীমের অনুভবই সব কিছু। সারদা দেবীর পারিবারিক মানুষদের অন্য এক পরিচয় পাই এই গ্রন্থে — তাঁরা অনেকেই চরম বিষয়ী, লোভী এবং সুবিধাবাদী। দিদি-রূপী এই দেবীকে তাঁরা দেখছেন নিজেদের সুবিধা আদায়ের বৃত্তে। সময় বিশেষে করছেন তাঁর অপমান, অসম্মান। অথচ অনন্তসহ্যময়ী সেই অসামান্যা তাঁর ত্যাগের ঐশ্বর্যে, ভালোবাসার অনির্বান শক্তিতে ক্ষমা করছেন সকলকে। একদিকে তাঁর ত্যাগী মঠবাসী ও গৃহী সন্তানেরা, অন্যদিকে তাঁর রক্তসম্পর্কের পরিজন — এদের কাকে ছেড়ে কাকে রাখবেন তিনি? নবকুমার দেখিয়েছেন, রাখবেন তিনি সকলকে। কারণ কেউ পর নয় তাঁর কাছে। সেখানে নরেন, বাবুরাম, লাটু, গিরিশ, বলরাম, খুকি (নিবেদিতা) যেমন আছে, তেমনই আছে প্রসন্ন, কালী, বরদা, নলিনী, মাকু, রাধু। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাইপো ও ভাইঝি রামলাল ও লক্ষ্মীর ঈর্ষাকাতর ক্ষুদ্র মনের পরিচয়ে বারে বারে দুঃখ পেয়েছেন তিনি, কিন্তু কখনো ক্রূদ্ধ হননি। সকলের মঙ্গলকামনা যে তাঁর সহজাত শক্তি। কারণ, তিনি সর্বলোকের মা বলে প্রতিষ্ঠিতা। সকলের কল্যাণ কামনাতেই তাঁর শান্তি। তাঁর ঈশ্বর, তাঁর ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রেমে সদা মগ্ন থেকেছে তাঁর চরাচর। মৃত্যুর করালগ্রাসে বারে বারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন এই দেবী — প্রাণপ্রিয় ত্যাগী সন্তানেরা থেকে ছোটভাই, দুধের শিশু নাতি, কতশত আত্মজন বিদায় নিয়েছে তাঁর সামনে। তদ্গত চিত্তে সব সয়েছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় ঠাকুরের কথা স্মরণ করে। লেখনীর গুণে যেসব চিত্র তৈরী করেছেন নবকুমার, তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট মনে হয়েছে ফলহারিণী কালীপূজার দিনে ষোড়শী পূজা। পূজক ও পূজিতার যে বর্ণনা দিয়েছেন, মনে হয়েছে তা বুঝি চোখের সামনে ঘটছে। সে ঘরের সুবাসটুকু যেন এসে লেগেছে পাঠকের মনে। সামান্য কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ও একই বাক্যের কিছু পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে এই গ্রন্থ রামকৃষ্ণ-সারদা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। আগামীর পাঠক এই গ্রন্থপাঠের মধ্যে দিয়ে জানবেন ঊনবিংশ শতকে জন্মানো এক নারীর মুক্ত থেকে মুক্ততর, শুদ্ধতম হয়ে ওঠার কাহিনী।

................

শ্রীময়ী মা 
নবকুমার বসু
আনন্দ পাবলিশার্স
প্রথম সংস্করণ: ২০০৯
প্রথম ই-বুক সংস্করণ: ২০২০

Comments